ট্রাম্পের ৫০০ শতাংশ শুল্ক হুমকি: ৮৭ বিলিয়ন ডলার রফতানি ঝুঁকিতে ভারত
- প্রকাশকাল ১২:২৯:০১ এএম, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬ ৯ পাঠক
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়া থেকে তেল, গ্যাস, ইউরেনিয়ামসহ অন্যান্য শক্তি পণ্য ক্রয়কারী দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। এই হুমকির অংশ হিসেবে ‘রাশিয়ান স্যাংশনস বিল প্রস্তাব’ নামে একটি দ্বিদলীয় বিল প্রস্তাব করা হয়েছে, যা কংগ্রেসে পাস হলে ভারত, চীন, ব্রাজিলের মতো দেশগুলোকে সরাসরি প্রভাবিত করবে।
সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম (রিপাবলিকান)এবং রিচার্ড ব্লুমেনথাল (ডেমোক্র্যাট) এই বিলের প্রধান প্রস্তুতকারী। গ্রাহাম জানিয়েছেন, ট্রাম্প ৭ জানুয়ারি ২০২৬-এ হোয়াইট হাউসে তাঁর সঙ্গে বৈঠকের পর এই বিলকে সবুজ সংকেত দিয়েছেন। বিলটি আগামী সপ্তাহে কংগ্রেসে ভোটের জন্য উঠতে পারে।
বিলের মূল উদ্দেশ্য
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে বাধ্য করা। বিলে বলা হয়েছে, যদি রাশিয়া ইউক্রেনের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় অসহযোগিতা করে, তাহলে রাশিয়ান তেল-গ্যাস ক্রয়কারী দেশগুলোর যুক্তরাষ্ট্রে রফতানিকৃত সব পণ্য ও সেবার ওপর কমপক্ষে ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করতে হবে। এটি রাশিয়ার যুদ্ধের অর্থায়ন বন্ধ করার লক্ষ্যে।
ভারতের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব
ভারত ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়া থেকে ছাড়ে অপরিশোধিত তেলের অন্যতম বৃহত্তম ক্রেতা। এই সস্তা তেল ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের চাপে আমদানি কমতে শুরু করেছে।
২০২৫ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে (মোট ৫০ শতাংশ), যা টেক্সটাইল, ফুটওয়্যার, সামুদ্রিক পণ্যের মতো শ্রম-নির্ভর খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
২০২৪ সালে ভারত যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৮৭.৪ বিলিয়ন ডলার পণ্য রফতানি করেছে, যা মোট রফতানির এক-পঞ্চমাংশের কাছাকাছি। ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হলে এই রফতানি কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতের আমদানি বর্তমানে ১২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। বিল পাস হলে দুইদিকের বাণিজ্যই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ-এর প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, এমন শুল্ক ভারতের রফতানিকে কার্যত বন্ধ করে দেবে। তবে বিল পাস হওয়ার সম্ভাবনা কম, কারণ এটি অত্যন্ত চরম পদক্ষেপ। ভারতের উচিত নিজের নীতি স্পষ্ট করা—রাশিয়া থেকে তেল কেনা চালিয়ে যাবে কি না।
প্রাক্তন বাণিজ্য সচিব অজয় দুয়া বলেন, এটি বাণিজ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের মতো। ভারতকে দ্রুত বিকল্প বাজার খুঁজতে হবে।
রাশিয়ান তেল আমদানির সাম্প্রতিক হ্রাস
চাপের মুখে ভারতের রাশিয়ান তেল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে:জুন ২০২৫-এ সর্বোচ্চ ২.১ মিলিয়ন ব্যারেল প্রতিদিন থেকে ডিসেম্বর ২০২৫-এ ৪০ শতাংশ কমে ১.২ মিলিয়ন ব্যারেল এ নেমেছে (Kpler এর ডেটা)। নভেম্বর ২০২৫-এ ১.৮ মিলিয়ন ব্যারেল থেকে ডিসেম্বর-এ ১.০ মিলিয়ন ব্যারেল নেমেছে ।
রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ ভারতের সবচেয়ে বড় ক্রেতা জানিয়েছে, ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহগুলোতে কোনো রাশিয়ান তেল আসেনি এবং জানুয়ারি ২০২৬-এ কোনো সরবরাহ হচ্ছে না। এতে জানুয়ারিতে আমদানি তিন বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামতে পারে। রাশিয়ান তেল কোম্পানি রোসনেফট ও লুকোইল-এর ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞার কারণে এই হ্রাস।
ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও অন্যান্য ঘটনা
বিলটি মূলত ভারতকে নিয়ে করা হয়েছে, চীন অনেকাংশে নিরাপদ থাকতে পারে। ভারতের ওপর এখন পর্যন্ত অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, চীনের বিরুদ্ধে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেই।
ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল সোলার অ্যালায়েন্স থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন, যা ভারত-নেতৃত্বাধীন এই সংস্থাকে প্রভাবিত করবে।ট্রাম্প বলেছেন, তার সিদ্ধান্ত থামাতে পারে শুধু তার নিজের নৈতিকতা। তিনি আন্তর্জাতিক আইন মানেন, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেবেন নিজে।
নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর ১২ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে দিল্লিতে দায়িত্ব নেবেন। তিনি বলেছেন, ভারতের রাশিয়ান তেল আমদানি বন্ধ করা তার “শীর্ষ অগ্রাধিকার”।
ভারত সরকার এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি, তবে দিল্লি বারবার বলেছে যে জ্বালানি সিদ্ধান্ত জাতীয় স্বার্থ ও সাশ্রয়ের ওপর নির্ভর করে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বিল চাপ সৃষ্টির কৌশল হতে পারে যাতে ভারত রাশিয়ান তেল কেনা কমায় বা বন্ধ করে। তবে পাস হলে ভারত-মার্কিন বাণিজ্য সম্পর্ক গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ভারতকে বিকল্প জ্বালানি উৎস মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্রের বাজার খুঁজতে হবে, এবং বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা আরো জটিল হয়ে উঠবে।
সূত্র:বিবিসি























